হোয়াটসঅ্যাপে পুলিশ-সেনা পরিচয়ে কল: ভয় দেখিয়ে অ্যাকাউন্ট দখল, স্বজনদের কাছ থেকে টাকা
পুলিশ, সেনা বা ব্যাংক কর্মকর্তার পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে ভয় দেখিয়ে সেটিংস বদলানো বা ওটিপি আদায় করে অ্যাকাউন্ট দখল করছে প্রতারক চক্র, এরপর পরিচিতজনদের কাছে টাকা দাবি করছে।
১১ জুলাই ২০২৬ সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, ব্যাংক কর্মকর্তা কিংবা মোবাইল অপারেটরের প্রতিনিধি পরিচয়ে হোয়াটসঅ্যাপে কল করে সাধারণ মানুষের অ্যাকাউন্ট দখল করে নিচ্ছে একটি সক্রিয় প্রতারক চক্র। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্য অনুযায়ী, গত ছয় মাসে এ ধরনের ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনায় প্রায় ২০টি মামলা হয়েছে এবং প্রতি মাসে অন্তত ৩০ থেকে ৪০টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হচ্ছে। বেশির ভাগ ভুক্তভোগীই মামলা পর্যন্ত যান না।
ভুক্তভোগীদের একজন আহমেদ আবিদুর রাজ্জাক খান। ২০২৫ সালের ১০ জুলাই তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে কল করে এক ব্যক্তি পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে বলেন, ‘আপনার মোবাইল নম্বর ক্লোন করে পুলিশের নামে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।’ ভয় পেয়ে তিনি কলদাতার নির্দেশমতো হোয়াটসঅ্যাপের সেটিংসে গিয়ে একটি অপশন চালু করেন, এরপর তাঁকে এক ঘণ্টা হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ রাখতে বলা হয়। অ্যাকাউন্ট চালু করে তিনি দেখেন, হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করে তাঁর বন্ধু ও স্বজনদের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। কলদাতার নম্বরটি তখন বন্ধ পাওয়া যায়। কলাবাগান থানায় মামলা করার পর এ ঘটনায় ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
চক্রের কৌশল প্রায় একই। কল আসে এমন হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে, যার প্রোফাইলে পুলিশ বা সেনা কর্মকর্তার পোশাক পরা ছবি থাকে। কলদাতা শুরুতেই আতঙ্ক তৈরি করেন — ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আপনি যুক্ত হলেন কীভাবে? আপনার নম্বর থেকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নম্বরে আপত্তিকর মেসেজ যাচ্ছে।’ বিচলিত হয়ে ‘কী করতে হবে’ জানতে চাইলে প্রতারক হোয়াটসঅ্যাপ সেটিংসে নিয়ে যায় এবং অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে ওটিপি আদায় করে নেয়। গত মে মাসে গণমাধ্যমকর্মী কামরুল হাসানের কাছেও একই কায়দায় ‘সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা’ পরিচয়ে কল আসে; সন্দেহ হওয়ায় তিনি সাড়া না দিলে প্রতারক কল কেটে দেয়। সমকালের সঙ্গে কথা বলা আটজন ভুক্তভোগীর কেউই মামলা বা জিডি করেননি।
পুলিশ বলছে, আগে সাধারণ ফোনকলে এ প্রতারণা হতো; এখন বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি ও ভয় দেখাতে হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী বা সরকারি কর্মকর্তার ছবি ব্যবহার করা হচ্ছে। ওটিপি পেয়ে প্রতারকরা প্রথমে বিকাশ, নগদ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে টাকা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তা না পারলে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করে সামাজিক মাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক করে পরিচিতজনদের কাছে টাকা দাবি করে। তদন্তে উঠে এসেছে, এ চক্রের বড় অংশ নাটোরের লালপুর ও রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাসিন্দা।
ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টারের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ সমকালকে বলেন, ‘পুলিশ কখনো ফোন করে কোনো নাগরিকের ওটিপি, পিন, পাসওয়ার্ড বা ব্যাংকিং-সংক্রান্ত তথ্য জানতে চায় না। কেউ পুলিশ পরিচয়ে এসব তথ্য চাইলে তাৎক্ষণিক সতর্ক হতে হবে।’ সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা বলেন, কেউ কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি পরিচয় দিলে কল কেটে দিয়ে ওই প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল নম্বরে নিজে যোগাযোগ করে যাচাই করাই একমাত্র নিরাপদ পথ।
CyberWise BD সতর্কতা: ইউনিফর্মের ছবি, একটি অভিযোগ আর একটি নির্দেশ — এই তিনটি একসঙ্গে এলে বুঝবেন এটি প্রতারণা। এই ঘটনার নির্দিষ্ট বিপদচিহ্নগুলো হলো: হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাইলে পুলিশ বা সেনা পোশাকের ছবি; ‘আপনার নম্বর ক্লোন হয়েছে’ বা ‘ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নম্বরে আপত্তিকর মেসেজ যাচ্ছে’ ধরনের অভিযোগ; হোয়াটসঅ্যাপ সেটিংসে যেতে বলা বা কোড পড়ে শোনাতে বলা; এবং কিছুক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ রাখতে বলা। কারও কথায় লিংকড ডিভাইস চালু করবেন না, ভেরিফিকেশন কোড কাউকে দেবেন না। হোয়াটসঅ্যাপে টু-স্টেপ ভেরিফিকেশন চালু করে এমন একটি পিন দিন যা শুধু আপনি জানেন — তাহলে শুধু ওটিপি দিয়ে কেউ অ্যাকাউন্ট নিতে পারবে না। যদি ইতিমধ্যে প্রতারণার শিকার হয়ে থাকেন, সঙ্গে সঙ্গে নিজের ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ আবার রেজিস্টার করুন, Settings → Linked Devices-এ গিয়ে অচেনা ডিভাইস লগআউট করুন, পরিচিতদের জানিয়ে দিন আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চাওয়া হলে তা ভুয়া, বিকাশ/নগদ/ব্যাংকের হেল্পলাইনে কল করে অ্যাকাউন্ট নিরাপদ করুন এবং নিকটস্থ থানা, ডিএমপি সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড সাপোর্ট সেন্টার বা ৯৯৯-এ অভিযোগ করুন।
সূত্র
- সমকাল — হোয়াটসঅ্যাপে পুলিশ-সেনা পরিচয়ে প্রতারণার কৌশল, ভুক্তভোগী আহমেদ আবিদুর রাজ্জাক খানের দেড় লাখ টাকা খোয়া যাওয়া ও ১১ জন গ্রেপ্তার, ডিএমপির ছয় মাসে ~২০টি মামলা ও মাসে ৩০–৪০টি জিডির তথ্য এবং ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহার বক্তব্য প্রকাশ করে (১১ জুলাই ২০২৬) — প্রতিবেদন পড়ুন
প্রতারকরা সাধারণত যেভাবে কাজ করে
- ভুয়া পরিচয়/প্রোফাইল দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়।
- সুযোগ বুঝে টাকা বা তথ্য চাওয়া হয়।
- কাজ হয়ে গেলে ব্লক করে বা অ্যাকাউন্ট গায়েব হয়।
নিরাপদ থাকার বাস্তব উপায়
- গুরুত্বপূর্ণ কিছু করার আগে পরিচয় নিশ্চিত করুন।
- খুব দ্রুত ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না।
- অন্য বিশ্বস্ত চ্যানেলে মিলিয়ে দেখুন।
সন্দেহ হলে এখনই যা করবেন
- 1সাথে সাথে যোগাযোগ বন্ধ করুন; আর টাকা বা কোড পাঠাবেন না।
- 2প্রমাণ রাখুন: স্ক্রিনশট, নম্বর, লিংক, ট্রানজেকশন আইডি, সময়।
- 3ব্যাংক/এমএফএস/অপারেটরে যোগাযোগ করে দ্রুত অ্যাক্সেস ফ্রিজ করুন।
- 4দ্রুত জিডি করুন এবং সাইবার কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট করুন।
প্রধান শিক্ষা
পুলিশ, সেনা কিংবা ব্যাংক কর্মকর্তা কখনোই ফোনে ওটিপি, পিন বা হোয়াটসঅ্যাপ সেটিংস বদলাতে বলবেন না — কেউ চাইলেই বুঝবেন, কলটিই প্রতারণা।